One Stop Digital Education Portal
সৌরজগতের অভ্যন্তরভাগ
Price: Free Course Post By: Hasan সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: 05 Sunday 2020

সৌরজগতের যে অংশটিতে পার্থিব গ্রহ ও গ্রহাণু থাকে সে অংশকে অভ্যন্তরভাগ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এ অংশের বস্তুগুলো মূলত সিলিকেট এবং ধাতু দ্বারা গঠিত। এই বস্তুগুলো সূর্যের বেশ কাছাকাছি অবস্থান করে। এই পুরো অংশের ব্যাসার্ধ্য বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়ে কম।

অভ্যন্তরভাগের গ্রহসমূহ
মূল নিবন্ধ: পার্থিব গ্রহ
ভেতরের অংশে মোট চারটি গ্রহ আছে যেগুলোকে পার্থিব গ্রহ বলা হয়। এই গ্রহগুলো খুব ঘন এবং এগুলোর গাঠনিক উপাদান পাথুরে। এগুলোর উপগ্রহের সংখ্যা খুবই কম, কোন কোনটির উপগ্রহই নেই। এছাড়া এগুলোর চারদিকে কোন বলয়ও নেই। এদের গাঠনিক উপাদান মূলত বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যাদের গলনাঙ্ক খুব বেশি। যেমন, তাদের ভূত্বক ও ম্যান্ট্‌ল সিলিকেট দ্বারা গঠিত এবং কেন্দ্র গঠিত লৌহ ও এ ধরনের অন্যান্য ধাতু দ্বারা। চারটির মধ্যে তিনটি গ্রহের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বায়ুমণ্ডল আছে। এই গ্রহ তিনটি হল শুক্র, মঙ্গল এবং পৃথিবী। আর সবগুলোরই সংঘর্ষ খাদ এবং ফাটল উপত্যকা ও আগ্নেয়গিরির মত টেকটোনিক পৃষ্ঠতলীয় কাঠামো আছে। ভেতরের দিকের গ্রহগুলোর সাথে নগণ্য গ্রহগুলোকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। যে গ্রহগুলো থেকে সূর্যের দূরত্ব পৃথিবীর চেয়ে কম সেগুলোকে নগণ্য গ্রহ বলে। বুধ এবং শুক্র নগণ্য গ্রহ।

বুধ গ্রহ
বুধ গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে (০.৪ এইউ) এবং এটি সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম (০.৫৫ পার্থিব ভর) গ্রহ। এর কোন প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। সংঘর্ষ খাদ ছাড়া এর একমাত্র জানা ভৌগোলিক ফিচার হচ্ছে লতিযুক্ত রিজ বা rupe। ইতিহাসের প্রথম দিকে যখন গ্রহের সংকোচন চলছিল তখন এগুলো সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বুধের বায়ুমণ্ডল অতি নগণ্য যার প্রধান উপাদান সৌরবায়ুর প্রভাবে পৃষ্ঠ থেকে সজোরে উৎক্ষিপ্ত পরমাণু। এর তুলনামূলক বড় লৌহ কেন্দ্র এবং সরু ম্যান্ট্‌লের ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন অনুকল্পে বলা হয়েছে, একটি বড় সংঘর্ষের মাধ্যমে গ্রহটির বহিস্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে গেছে এবং নিকটবর্তী সূর্যের শক্তির প্রভাবে এর কোন বিবৃদ্ধিও ঘটেনি।
শুক্র গ্রহ
শুক্র গ্রহের আকার (০.৮১৫ পার্থিব ভর) প্রায় পৃথিবীর সমান এবং সূর্য থেকে এর দূরত্ব ০.৭ এইউ। পৃথিবীর মতই এই গ্রহের ম্যান্ট্‌ল সিলিকেট দ্বারা এবং কেন্দ্রভাগ লৌহ দ্বারা গঠিত। এর বায়ুমণ্ডল বেশ পুরু এবং এর ভেতরের অংশে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবশ্য গ্রহটি পৃথিবীর তুলনায় অনেক শুষ্ক এবং এর বায়ুমণ্ডল আমাদের থেকে ৯০ গুণ বেশি ঘন। এরও কোন প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৪০০° সেলসিয়াস হওয়ায় এটি সৌরজগতের সবচেয়ে উত্তপ্ত। বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউজ গ্যাস থাকার কারণেই এর তাপমাত্রা এতো বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে কোন ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়া সংঘটিত হয় বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য পুরুত্বের বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় চৌম্বক ক্ষেত্র নেই তার। এ থেকে বোঝা যায়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে এর বায়ুমণ্ডল নিয়মিত পূর্ণ হতে থাকে। এর ফলে চৌম্বক ক্ষেত্রের অপ্রতুলতা কাটিয়ে উঠা যায়।
পৃথিবী
পৃথিবী সৌরজগতের ভেতরের অংশের সবচেয়ে ঘন ও বড় গ্রহ। এটিই এ অঞ্চলের একমাত্র গ্রহ যাতে বর্তমানেও ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে। এটা আমাদের জানা একমাত্র গ্রহ যাতে জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে। এর তরল জলমণ্ডল সৌরজগতের ভেতরের অংশে অনন্য। এটিই একমাত্র গ্রহ যাতে গ্রহ টেকটোনিক পর্যবেক্ষন করা গেছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অন্যান্য যেকোন গ্রহ থেকে অনেক ভিন্ন। এখানে শতকরা ২১ ভাগ অক্সিজেন থাকার কারণেই জীবনের বিকাশ ঘটা সম্ভব হয়েছে। এর একটি মাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ আছে যার নাম চাঁদ বা 'মুন'। সৌরজগতের অন্য কোন পার্থিব গ্রহের এত বড় উপগ্রহ নেই।
মঙ্গল
মঙ্গল গ্রহ পৃথিবী ও শুক্রের চেয়ে ছোট (.১০৭ পার্থিব ভর)। এর একটি পাতলা বায়ুমণ্ডল আছে যা মূলত কার্বন ডাই অক্সাইড দিয়ে গঠিত। পৃষ্ঠতলে প্রচুর সংখ্যক আগ্নেয়গিরি (যেমন অলিম্পাস মন্‌স) ও ফাটল উপত্যকায় (যেমন ভ্যালিস মেরিনারিস) পরিপূর্ণ। এ থেকে বোঝা যায় এর ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া খুব বেশি দিন আগে থেমে যায়নি। লৌহ সমৃদ্ধ মাটিতে মরিচা পড়ার কারণেই গ্রহটির রং লাল। মঙ্গলের দুটি ছোট ছোট উপগ্রহ আছে যাদের নাম ডিমোস এবং ফোবোস। ধারণা করা হয়, মঙ্গল অনেক আগে কোন গ্রহাণুকে নিজ মহাকর্ষের বন্ধনে বেঁধে ফেলেছিল এবং এভাবেই উপগ্রহগুলোর সৃষ্টি হয়।
গ্রহাণু বেষ্টনী
মূল নিবন্ধ: গ্রহাণু বেষ্টনী
গ্রহাণুগুলো মূলত খুব ছোট ছোট সৌর জাগতিক বস্তু যেগুলো ধাতব পাথুরে খনিজ পদার্থ দিয়ে গঠিত। এই খনিজ পদার্থগুলো অনুদ্বায়ী।

মূল গ্রহাণু বেষ্টনীটি মূলত একটি কক্ষপথ যা পৃথিবী এবং মঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। সূর্য থেকে এই বেষ্টনীর নিকটবিন্দু এবং দূরবিন্দুর দূরত্ব যথাক্রমে ২.৩ এইউ এবং ৩.৩ এইউ। ধারণা করা হয়, সৌরজগতের গঠনকালীন সময়ে বৃহস্পতি গ্রহের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে যে বস্তুগুলো একসাথে মিলে বড় কোন বস্তুতে পরিণত হতে পারেনি সেগুলোই এই বেষ্টনীতে আশ্রয় নিয়েছে।

গ্রহাণুর আকার বিভিন্ন রকমের হতে পারে। কয়েক শত কিলোমিটার থেকে শুরু করে এদের ব্যাসার্ধ্য আণুবীক্ষণিকও হতে পারে। বৃহত্তম গ্রহাণু সেরেস ছাড়া বাকি সবগুলো গ্রহাণুই "ক্ষুদ্র সৌর জাগতিক বস্তু" শ্রেণীর মধ্যে পড়ে। অবশ্য ৪ ভেস্তা ও ১০ হাইজিয়া নামক গ্রহাণু দুটি ভবিষ্যতে বামন গ্রহ শ্রেণীতে জায়গা করে নিতে পারে। তরলস্থৈতিক সাম্যাবস্থা অর্জনে সমর্থ হলেই কেবল বামন গ্রহের কাতারে দাড়াতে পারবে তারা।

গ্রহাণু বেষ্টনীতে দশ-বিশ হাজার বস্তু আছে যেগুলোর ব্যাস এক কিলোমিটারের উপরে। এই সংখ্যা কয়েক মিলিয়নও হতে পারে। তারপরও সমগ্র গ্রহাণু বেষ্টনীর ভর পৃথিবীর ভরের হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে সামান্য বেশি। বেষ্টনীতে গ্রহাণুগুলো খুব একটা ঘন সন্নিবেশিত নয়। পৃথিবী থেকে প্রেরিত নভোযানগুলো কোন রকমের দুর্ঘটনা ছাড়াই নিয়মিত এই বেষ্টনী অতিক্রম করে থাকে। যে গ্রহাণুগুলোর ব্যাস ১০ থেকে ১০৪ মিটারের মধ্যে সেগুলোকে উল্কা বলা হয়।

সেরেস
সেরেস গ্রহাণু বেষ্টনীর বৃহত্তম বস্তু। একে বামন গ্রহ শ্রেণীর মধ্যে ফেলা হয়েছে। সূর্য থেকে এর দূরত্ব ২.৭৭ এইউ এবং এর ব্যাস ১০০০ কিলোমিটার থেকে সামান্য কম। নিজস্ব অভিকর্ষের মাধ্যমে গোলকীয় আকৃতি লাভ করার জন্য এই ব্যাস যথেষ্টই বেশি। ঊনবিংশ শতকে যখন এটি আবিষ্কৃত হয় তখন সবাই গ্রহ বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের পর প্রতিবেশে অন্যান্য গ্রহাণু আবিষ্কৃত হওয়ায় ১৮৫০-এর দশকে গ্রহাণু হিসেবে চিহ্নিত হয়। আর ২০০৬ সালে এসে একে বামন গ্রহ হিসেবে পুনরায় শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।
গ্রহাণু শ্রেণী
কক্ষপথের বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে এই বেষ্টনীর গ্রহাণুগুলোকে গ্রহাণু শ্রেণী এবং পরিবারে বিভক্ত করা হয়। যে গ্রহাণুগুলো অপেক্ষাকৃত বড় গ্রহাণুকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে সেগুলোকে গ্রহাণু চাঁদ বলা হয়। এই চাঁদগুলো অবশ্য মোটেই গ্রহীয় চাঁদের মত নয়। কোন কোন গ্রহাণু চাঁদ আকারে তার মাতৃ গ্রহাণুর প্রায় সমান। গ্রহাণু বেষ্টনীতে মূল-বেষ্টনী ধূমকেতুও থাকে। ধারণা করা হয়, এই ধূমকেতুগুলোই পৃথিবীতে পানির উৎস হিসেবে কাজ করেছিল।
বৃহস্পতি গ্রহের এল৪ ও এল৫ বিন্দুগুলোর যেকোনটিতে ট্রোজান গ্রহাণুদের বাস। এই বিন্দুগুলো হল মহাকর্ষীয়ভাবে স্থিতিশীল অঞ্চল যারা কোন গ্রহের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় বা কক্ষপথে গ্রহটিকে অনুসরণ করে চলে। অন্য যেকোন গ্রহ বা উপগ্রহের ল্যাগ্রেঞ্জ বিন্দুতে অবস্থিত ছোটখট বস্তু বোঝাতেও কখনও কখনও "ট্রোজান" শব্দটি ব্যবহৃত হয়। হিলডা গ্রহাণুসমূহ বৃহস্পতির সাথে ২:৩ রেজোন্যান্সে অবস্থান করছে। অর্থাৎ তারা বৃহস্পতিকে যে সময়ে ২ বার আবর্তন করে সে সময়ে সূর্যকে ৩ বার আবর্তন করে।

এছাড়াও সৌরজগতের অভ্যন্তরভাগে প্রচুর রুজ গ্রহাণু আছে। এই গ্রহাণুর অনেকগুলোই অভ্যন্তরভাগের গ্রহগুলোর কক্ষপথকে অতিক্রম করে যায়।