One Stop Digital Education Portal
ফুসফুসে ইনফেকশন হলে কি করবেন
Price: 0 Post By: Dr. Jesmin Sultana সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: 06 Monday 2020

কথায় আছে, দমে জীবন, দমে মরণ। আর মানুষসহ সকল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দম তথা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে ফুসফুস। একে বলা হয় শ্বাসযন্ত্র। ফুসফুসের প্রধান কাজ বাতাস থেকে অক্সিজেনকে রক্তপ্রবাহে নেওয়া এবং রক্তপ্রবাহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়ে দেওয়া। এই দুটি গ্যাসের আদান-প্রদান হয় বিশেষ ধরনের এক কোষ দ্বারা তৈরি খুবই পাতলা লক্ষাধিক বায়ুথলির মাধ্যমে। যাকে বলা হয় অ্যালভিওলাই।



ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
মানবদেহের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে তার মধ্যে ফুসফুস অন্যতম। কেননা এর মাধ্যমেই আমরা বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিজেন পাই। আবার আমাদের দেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ত্যাগ করি। আমরা অনেক সময় বিভিন্নজনকে শ্বাসকষ্টে ভুগতে দেখি। এর কারণ হলো ফুসফুসের ইনফেকশন। শ্বাসকষ্ট হলো ফুসফুস ইনফেকশনের অতি সাধারণ এক রোগ। কিন্তু এর বাইরে আরো অনেক জটিল রোগ হতে পারে যদি আমাদের বায়ুথলি কোনো কারণে সংক্রমিত হয়।



ফুসফুসের ইনফেকশন কী
মূলত নাক ও মুখের মধ্যে দিয়ে যদি কোনো ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস দেহের ভেতরে প্রবেশ করে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে তাহলে তাকে ফুসফুসের ইনফেকশনের বলে। ফুসফুসের ইনফেকশনের হলে অনেক সময় শ্বাসনালী ফুলে যায়৷ যার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়। ফুসফুস যেহেতু আমাদের দেশে একাধিক কার্য সম্পাদন করে থাকে তাই ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ার ফলে শ্বাসকষ্ট ছাড়াও আরো অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। শিশু বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সকলেরই এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।







ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণ
ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণগুলো মাঝারি থেকে তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে৷ তবে সেটা নির্ভর করে রোগীর বয়স, স্বাস্থ্যের সর্বোপরি অবস্থা এবং ইনফেকশনের কারণ। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক, এর মধ্যে যেকোনো একটির আক্রমণে ফুসফুস সংক্রমিত হলে তার লক্ষণ প্রকাশ পায়৷ কিন্তু লক্ষণগুলো কখনো আলাদাভাবে বোঝা যায় না। তবে অনেক সময় লক্ষণ সমূহের স্থায়ীত্বতা থেকে ফুসফুস ইনফেকশনের কারণ বোঝা যায়৷ এবার তাহলে ফুসফুস ইনফেকশনের সাধারণ লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

ফুসফুস ইনফেকশনের প্রধান লক্ষণ কফের সাথে ঘন শ্লেষ্মা বা মিউকাস বের হওয়া। রোগীভেদে এই মিউকাসের রং ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে খারাপ দিক হলো কফের সাথে রক্ত পড়া৷ যদি কারো কফের সাথে রক্ত পড়ে তাহলে বুঝতে হবে তার ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে এবং তার অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ফুসফুসে ইনফেকশনের কারণে শ্বাসকষ্ট হয়৷ যার ফলে বুকে ব্যথা সৃষ্টি হয়। এই ব্যথা কখনো মাঝারি, আবার কখনো মারাত্মক আকারে হয়ে থাকে৷ ফুসফুসের ইনফেকশনের কারণে একনাগাড়ে কয়েকদিন বুকে ব্যথা অনুভব হয়।

অনেক সময় ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার কারণে আমাদের শরীরে জ্বর হয়ে থাকে। আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে যদি ফুসফুস সংক্রমিত হয় তাহলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। অতিরিক্ত জ্বরের কারণে শরীরে ঘাম, পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা ও দুর্বলতাসহ আরো অনেক লক্ষণ দেখা দেয়। যদি শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে পেশি ও পিঠে ব্যথা হয়। একে মায়ালজিয়া বলা হয়। এর ফলে অনেক সময় পেশির মধ্যে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

ফুসফুস সংক্রমিত হলে নিঃশ্বাসে দুর্বলতার সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর ফলে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে যায় এবং ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

প্রশ্বাসের মাধ্যমে যখন বায়ু ত্যাগ করা হয় তখন যদি বুকের মধ্যে আওয়াজ হয়৷ যা ফুসফুস ইনফেকশনের স্পষ্ট লক্ষণের মধ্যে একটি। মূলত শ্বাসনালি ছোট সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে এই সমস্যা হয়।

ফুসফুস সংক্রমিত হলে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়৷ ফলে আমাদের শরীর খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অল্পতেই শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে তা ফুসফুসের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

ফুসফুসের ইনফেকশনের কারণে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়৷ ফলে ঠোঁট ও হাতের নখ হালকা নীলাভ বর্ণ ধারণ করে।



ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে যেসব রোগ হয়
ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে অসংখ্য রকমের রোগ হয়ে থাকে। তবে প্রধান তিনটি রোগ হলো ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিস। এর প্রত্যেকটি ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়ে থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অথবা রেসপিরেটরি সিনশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) আক্রমণে ব্রঙ্কাইটিস হয়ে থাকে। অন্যদিকে ব্রঙ্কাইটিসের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে রয়েছে মাইক্রোপ্লাজমা নিউমোনিয়ে, ক্লামাইডিয়া নিউমোনিয়ে এবং বোর্ডেটেলা পার্টুসিস। নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী স্ট্রেপটোকোকাস নিউমোনিয়া ও মাইক্রোপ্লাজমা নিউমোনিয়ে ভাইরাস এবং আরএসভি ব্যাকটেরিয়া।

প্রধান তিনটি রোগ ছাড়াও ফুসফুসের ইনফেকশন থেকে অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ হয়ে থাকে। ফুসফুসের সমস্যার কারণে রক্তনালি ও বুকে আরো বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে৷ তাই এই রোগকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই।



কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
সময়মত চিকিৎসা গ্রহণ না করলে ফুসফুস ইনফেকশন মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। যদি কারো তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি হয় অথবা শ্বাস-প্রস্বাসে সমস্যা হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে চিকিৎসক দেখানোর ক্ষেত্রে বয়স ও রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তিন মাসের কম বয়সী কোনো বাচ্চার যদি একনাগাড়ে কয়েকদিন ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর থাকে তাহলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উত্তম। ৩-৬ মাস এবং ৬-২৪ মাস বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জ্বরের এই মাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি৷ আর জ্বরের স্থায়ীত্ব হতে হবে কমপক্ষে দুই দিন। এর চেয়ে অধিক বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে টানা তিনদিন ১০২.২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বরের পাশাপাশি যদি বমি ও প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। বড়দের ক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা ১০৩ ডিগ্রির বেশি হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আবশ্যক।



ফুসফুসের ইনফেকশন নির্ণয়ের টেস্ট
শ্বাস-প্রস্বাসে কোনো সমস্যা হলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এরপর চিকিৎসকের কাছে পূর্বের সকল রোগ এবং শরীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খুলে বলতে হবে। এমনকি আপনি কোন ধরনের পেশার সাথে জড়িত, কোন এলাকায় থাকেন, সর্বশেষ কোথায় ভ্রমণ করেছেন কিংবা কোন কোন প্রাণীর সংস্পর্শে ছিলেন সবকিছুই চিকিৎসকের কাছে বলতে হবে। সাধারণত চিকিৎসকরা নিজে থেকে এসব প্রশ্ন করে থাকেন। এরপরও নিজে থেকে এই বিষয়গুলো বিস্তারিত জানানো উচিত।

চিকিৎসক সাধারণত শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বুকের ভেতরে কোনো শব্দ হয় কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেন। এর মধ্যে রয়েছে বুকের এক্স-রে অথবা সিটি স্ক্যান, নিঃশ্বাসের গতি পরিমাপের জন্য স্পাইরোমেট্রি টেস্ট, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য পালস অক্সিমেট্রি, কফ পরীক্ষা, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) টেস্ট এবং ব্লাড কালচার টেস্ট।







ফুসফুস ইনফেকশন হলে করণীয়
চিকিৎসকের দেওয়া পরীক্ষা থেকে যদি ফুসফুসের ইনফেকশন ধরা পড়ে তাহলে তার ধরন অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ করতে হবে। ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কিন্তু ভাইরাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। এর বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লড়াই করে। অনেক সময় তা দীর্ঘায়িত হয়। আর ছত্রাকের কারণে যদি ফুসফুসের ইনফেকশন হয় তাহলে ছত্রাক প্রতিরোধী হিসেবে কিটোকোনাজল অথবা ভোরিকোনাজল গ্রহণ করতে হয়।

তবে ঔষধের পাশাপাশি কিছু খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ফুসফুসের ইনফেকশন থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়। এই ইনফেকশন থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রচুর পানি পান করতে হবে, সেই সাথে আদা বা মধুর সাথে চা খেতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি করলে ফুসফুসের ইনফেকশন দ্রুত উপশম হয়। আর কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ না করে ঔষধ বন্ধ করা যাবে না।



ফুসফুসে ইনফেকশন হলে কিভাবে প্রতিরোধ করবেন
ফুসফুস ইনফেকশন পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও একটু সচেতন হলেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এই রোগ সরাসরি পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার উপর নির্ভরশীল। তাই দূষিত ধূলিকণা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে গেলে নাক ও মুখে মুখোশ লাগিয়ে চলাফেরা করা উচিত। নিয়মিত হাত পরিস্কার রাখার পাশাপাশি বারবার ফেস ও মুখ হাতানো থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদের সাথে খাবারের কোনো পাত্র, খাবার ও পানীয় শেয়ার না করা উত্তম। পাশাপাশি জনবহুল জায়গাগুলো এড়িয়ে চলা ভালো৷ কারণ এসব জায়গা থেকে খুব সহজে ভাইরাস ছড়ায়। ফুসফুসের যেকোনো সমস্যা থেকে দূরে থাকার জন্য ধূমপান থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনকে প্রতিরোধ করার জন্য দুই ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে। যথা: পিসিভি১৩ নিউমোকাকাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (PCV13 pneumococcal conjugate vaccine) এবং পিপিএসভি২৩ নিউমোকাকাল পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সী মানুষ নিতে পারবেন।